আশুলিয়ার ভাদাইল এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় স্বামী-স্ত্রীর মাদক সেবন এবং সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াতের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে যুবকদের ডেকে এনে মারধর করে টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
অভিযোগকারী বাড়ির মালিক মো. সুমনের দাবি, ওই বাসায় বসবাসকারী আনিকা লতিফ ও তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন করে আসছেন। তাদের কক্ষে বিভিন্ন সময় আরও কয়েকজন মাদকসেবীর আসা-যাওয়া ছিল বলেও তিনি জানান। এ বিষয়ে তার কাছে ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সুমনের অভিযোগ, আনিকার সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। পরে আনিকা তাকে আশুলিয়ার বলিভদ্র এলাকায় দেখা করার কথা বলে নিয়ে যান। সেখানে পোশাক কারখানার সুপারভাইজার আব্দুল্লাহর সহযোগিতায় তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। ওই সময় তার কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন ও নগদ ২০ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয়।
সুমনের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে বাসায় থাকা আনিকার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। এ সময় তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। তবে তার বক্তব্যও নেওয়ার চেষ্টা করেন সাংবাদিকরা। ঘটনাস্থলে থাকা একটি মোবাইল ফোনে আনিকা ও তার স্বামীকে মাদক সেবন করতে দেখা যায় এমন একটি ভিডিও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এছাড়া ওই বাসায় বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াত এবং মাদক সংশ্লিষ্টতার আরও কিছু তথ্য ও ভিডিও থাকার কথা জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
বিষয়টি জানার পর ওই বাসার বাড়িওয়ালা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে জানান। পরে আশুলিয়া থানার এসআই জোহরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে যান। বাড়ির মালিক ও ভুক্তভোগীর অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর মাদক সেবন, যুবককে ডেকে নিয়ে মারধর এবং তার কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগীর কাছ থেকে নেওয়া মোবাইল ফোন ও টাকা উদ্ধারেরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং ঘটনাস্থলে গিয়ে এসআই জোহরুল ইসলাম পোশাক কারখানার সুপারভাইজার আব্দুল্লাহর একটি অভিযোগের কথা বলেন বলে অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করেছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা এসআই জোহরুল ইসলামের কাছে জানতে চান, তিনি কোন অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে এসেছেন এবং তার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আছে কি না। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের দাবি, এ সময় এসআই জোহরুল কোনো লিখিত অভিযোগ দেখাতে পারেননি। তিনি কোন অভিযোগের ভিত্তিতে সেখানে এসেছেন, সেটিও স্পষ্ট করেননি। পরে আব্দুল্লাহর একটি লিখিত অভিযোগের কথা সামনে আসে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, থানায় ওই অভিযোগ করেছেন যে ব্যক্তি, তিনিই ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের সঙ্গে জড়িত। আব্দুল্লাহর সঙ্গে ওই ঘটনার সম্পৃক্ততার বিষয়ে ভিডিও ফুটেজ এবং তার নিজের বক্তব্যও রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
৯৯৯-এ ফোন করা হয়েছিল মাদক সেবন, যুবককে মারধর এবং তার কাছ থেকে মোবাইল ও টাকা নেওয়ার বিষয় জানিয়ে। পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়নি। বরং এসআই জহিরুল ইসলাম আব্দুল্লাহর অভিযোগের বিষয়টি সামনে এনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়েই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এসআই জহিরুল ওই লিখিত অভিযোগের বাদী আব্দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। এ সময় ভুক্তভোগী তার মালামাল ফেরত না পেয়েই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছেন। ঘটনার পর থেকে এসআই জহিরুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী বাড়ির মালিক, ভুক্তভোগী ও ঘটনাস্থলে থাকা গণমাধ্যমকর্মীরা।
তাদের প্রশ্ন, ৯৯৯-এ অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে যদি অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তও না করে, তাহলে ওই অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কীভাবে? আর যদি একজন ব্যক্তিকে মারধর করে তার মোবাইল ও টাকা নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়, তাহলে তার কাছ থেকে নেওয়া মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করা হলো না কেন? অভিযোগকারীদের দাবি, ঘটনাস্থলে থাকা ভিডিও, মাদক সেবনের ফুটেজ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ভুক্তভোগীর অভিযোগ যাচাই করলেই ঘটনার সত্যতা অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
ঘটনার বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনাস্থলে এসআই জোহরুল ইসলামকে পাঠানো হয়েছে।
তবে ঘটনাস্থলে থাকা অভিযোগকারী ও গণমাধ্যমকর্মীদের দাবি, এসআই জোহরুল সেখানে গিয়ে মূল অভিযোগের বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে পাল্টা অভিযোগের কথা বলেন।
ঘটনার বিষয়ে এসআই জোহরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’ এ সময় তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কি আপনাকে অভিযুক্তদের সহযোগিতা করতে বলেছেন?’ এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ঘটনাটি নিয়ে বাড়ির মালিক ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, ৯৯৯-এ করা কলের রেকর্ড, ঘটনাস্থলের ভিডিও, মাদক সেবনের ভিডিও, ভুক্তভোগীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে যুবককে ডেকে এনে মারধর ও তার কাছ থেকে মোবাইল ও টাকা নেওয়ার অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেছেন তারা। পাশাপাশি এসআই জোহরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে কেন মূল অভিযোগের ব্যবস্থা না নিয়ে পাল্টা অভিযোগের কথা বললেন, কেন ভুক্তভোগীর মালামাল উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলো না এবং কেন অভিযোগকারী আব্দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করলেন, এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
ঘটনার প্রকৃত সত্য বের করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ভিডিও ফুটেজ ও ৯৯৯-এর কলের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।